আমার গল্পের পাঁচজন সাংবাদিক






গুড় ফ্যাক্টরির উত্তেজিত কর্মীদের বিক্ষোভ সমাবেশ। হাজার হাজার লোক। আমার চেনা পরিচিত পাঁচজন সাংবাদিক ইভেন্ট কভার করছিল।
প্রথম সাংবাদিক ক্ষুদিরাম। ও মাইক ধরে বলেই চলেছে, "আমরা এখন আন্দোলনকারীদের মূল মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। শ্রম আইন লঙ্ঘন এবং বকেয়া বেতনের যে দাবি তারা তুলছেন, তা সম্পূর্ণ সাংবিধানিক। আন্দোলনের মূল নথি ও তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কর্পোরেট মালিকপক্ষের ব্যর্থতাই আজকের এই চরম বিশৃঙ্খলার মূল কারণ। মালিকপক্ষ ন্যূনতম বেতন, কাজের ঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, বাৎসরিক ছুটি, স্বাস্থ্য বীমা নিয়ে উদাসীন। এই মুহূর্তে এই আন্দোলন চত্বরে কর্পোরেট জুলুমবাজির বিরুদ্ধে কয়েক হাজার লোক অবস্থান করছে…..." । তারপর কুড়ি বছর পেরিয়ে এসেছি। সাংবাদিক ক্ষুদিরামের চাকরি সেদিনই চলে গেছে। শুনেছি ওই গুড় কোম্পানির মালিকের শ্বশুরের অংশীদারিত্বে চলা সংবাদ কোম্পানিতে চাকরি করত ক্ষুদিরাম। নালিশ গেল ক্ষুদিরামের মালিকের কাছে। তারপর ক্ষুদিরামের চাকরি নট।
দ্বিতীয় সাংবাদিক নয়ন। ক্ষুদিরামের থেকে সাত হাত দূরে থাকে ছেলেটা। ও আবার গতানুগতিক স্টাইলে রিপোর্টিং করে। ভীড়ের বাইরে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। এদের ভাগ্যটাও খুব ভাল থাকে। এরা ভীড়ের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্সে চাপা রোগী পেয়ে যায়। এরা বাচ্চা বোঝাই স্কুল বাস পেয়ে যায়। না পেলেও অন্য কোন ভিডিও ঢুকিয়ে দিয়ে একটা রিপোর্ট তৈরি করে ফেলে। এই সাংবাদিক মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরে। এর কাছে ওই বিক্ষোভ সমাবেশ ছাড়া যারা আছে তারাই মানুষ। ও মানুষের কাছে থাকে। নয়ন ওইভাবেই আছে। জীবনের কোন চড়াই উৎরাই নেই। ও এখনো কোন সমাবেশের পাশে ক্যামেরা আর মাইক হাতে দাঁড়িয়ে অ্যাম্বুলেন্স খোঁজে। ও সামান্য বেতনের গ্রাউন্ড রিপোর্টার। ঘেমে নেয়ে লাস্ট লোকালে এখনো বাড়ি ফেরে।
তৃতীয় সাংবাদিক সুপ্রতিম। ও আবার থ্রিলার টাইপের কন্টেন্ট বানায়। এখানে ওর ক্যামেরা পুলিশের লাঠি দেখছে। জল কামান দেখছে। পেলেট গান দেখছে। ওর বলার ভঙ্গি ছিল নাটকীয়। চিল চিৎকার করে অনর্গল বলেই চলেছে, "পরিস্থিতি অত্যন্ত অগ্নিগর্ভ! পুলিশ হেলমেট পরছে, টিয়ার গ্যাসের শেল উঁচিয়ে রণং দেহি ভাব। আপনারা দেখুন আমার ডানদিকে অতর্কিত হামলা প্রতিরোধ করতে পুলিশ সতর্ক হয়েছে। যে কোন মুহূর্তে পুলিশের ওপর জলের বোতল, জুতো, চটি, গালাগালি ভেসে আসতে পারে। একেবারে মুখোমুখি অবস্থান। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হতে পারে লাঠিচার্জ! লাঠিচার্জ হলে আন্দোলনকারীরা তার জবাব দেবে। এইসব নিয়ে এখানকার পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে……..”। সুপ্রতিম কোন এক বড় খবর কোম্পানির সম্পাদকের চাকরি করছে। মোটা মাইনে। সারা পৃথিবীর লোক তাকে লাইভ দেখে সবসময়। সব খবরেই ও একটা উত্তেজনা তৈরি করে টিআরপি বাড়ায়। পাবলিক কি খাবে সেটা ও ভালভাবে রপ্ত করেছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভালই আছে।
চতুর্থ সাংবাদিক আসাদুল্লা। নামটা ইচ্ছে করেই অন্য ধর্মের রাখলাম। নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হচ্ছে গল্পের চরিত্রগুলোর মধ্যে। আসাদুল্লা ধরেছে অন্য সুর। ও মাইক হাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলছে, “…আন্দোলনের মধ্যে বিদেশি ফান্ডিং-এর কথা একেবারে অস্বীকার করা যাচ্ছেনা। দুবাই, কানাডা, চীন, পাকিস্তান থেকে টাকা দিয়ে সাহায্য করা হচ্ছে। এইরকম খবর সূত্র মারফত পাওয়া যাচ্ছে। দেশের সুরক্ষাকে দুর্বল করতে বিদেশি চক্রান্তের জবাব দেওয়ার উপযুক্ত সময় এসেছে। সুরক্ষার সঙ্গে সমঝোতা করা যাবেনা…………”। আসাদুল্লা এখন নিজেই একটা খবর কোম্পানির মালিক। বেশ কয়েক বছর আগে ক্ষুদিরাম পুরোন পরিচয়ের সূত্র ধরে একটা কাজ চাইতে গিয়েছিল। পাত্তা দেয়নি আসাদুল্লা।


পঞ্চম সাংবাদিক মাইকেল। ও একটা মুসলমান ফুচকাওয়ালা খুঁজে পেল। ফুচকাওয়ালাকে প্রশ্ন করল, "তুমি হাতে গ্লাভস না পরে ফুচকা দিচ্ছ কেন! ওই হাতে তুমি গোস্ত খাও। তোমার ফুচকা সনাতনীরা কেন খাবে! তুমি এখানে সাহস করে বিক্রি করতে পারছ কারণ এটা আমাদের দেশ। তুমি এখনো যে ধোলাই খাওনি এটা আমাদের রাষ্ট্রবাদের জন্যেই। তোমার ফুচকার ঠেলা উলটে দেওয়া হয়নি কারণ আমরা সনাতনী হিন্দু.........."। এইসব শুনে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু ছেলেপুলে সত্যি সত্যিই ঠেলা উলটে দিল। তারপর লাথি, ঘুঁষি, চড় থাপ্পড়, গুঁতো। খবর খাওয়ানোর জন্যে এইরকম মশলা খুঁজত মাইকেল। মাইকেল সাংবাদিকতার লাইন অনেকদিন আগেই ছেড়ে দিয়েছে। এখন ও বড় নেতা। ভোটে জিতেছে। মন্ত্রী হয়েছে। চেনাশোনা এক সার্ভিস এজেন্সিকে বলে কয়ে আমার গল্পের ক্ষুদিরামকে নিজের সরকারি বাংলোয় সিকিউরিটি গার্ডের বেসরকারি একটা চাকরি পাইয়ে দিয়েছে।

Post a Comment

0 Comments