রাত দিন ধার দিন

ঋণের দায়ে সাম্রাজ্য হারানোর ঘটনা ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই পাওয়া যায়। আউধ বা অযোধ্যার নবাব আসাদ-উদ-দৌলা ইংরেজদের দেওয়া ঋণের ফাঁদে পড়ে আদ্ধেক রাজ্য হারিয়েছিলেন। ১৮২৯ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত হায়দারাবাদের নিজাম ছিলেন আসফ জাহ (চতুর্থ) বা নাসির-উদ-দৌলা। ইনি ঋণের দায়ে জর্জরিত হলে হায়দারাবাদের সবচেয়ে উর্বর কৃষিক্ষেত্র ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যায়। তাঞ্জাভুরের মারাঠি শাসক ছিলেন তুলজাজিও। ঋণের দায়ে জর্জরিত করে তাঞ্জাভুর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে চলে যায় ১৭৯৯ সালে।

Debts of Arcot ছিল একটা ধারাবাহিক ঋণদান প্রবাহ। কর্ণাটকের নবাব মুহম্মদ আলি খান ওয়ালাজাহ ১৭৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে ধার নিতে শুরু করেন। ১৮০১ সাল এই ঋণ প্রবাহের শেষ পর্যায়। ঋণের পরিমাণ এতই বেড়ে যায় যে নবাবের কাছ থেকে রাজ্যের প্রশাসনিক ও সামরিক ক্ষমতা কেড়ে নেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। টিপু সুলতানের সঙ্গে ইংরেজদের শত্রতার মূলে ছিলে ইংরেজ কোম্পানি দ্বারা টিপু সুলতানের ওপর ঋণ চাপিয়ে দেওয়া। ধার শোধ না করতে পারার জন্যে ইংরেজরা টিপুর দুই ছেলেকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল।

ব্যাবিলনের মানুষ ও রাজারা ঋণে ডুবে থাকতেন। হামুরাবি রাজা হয়ে ঋণ মকুব করার জন্যে clean slate decree তৈরি করেছিলেন। রাজারা জনতার দুর্দশা উপলব্ধি করে ক্লিন স্লেট দিতেন। মানে সাধারণ জনতার ঋণ মকুব করে দিতেন। আভ্যন্তরীণ ধারদেনার ও আনুষঙ্গিক সঙ্কটের জন্যেই ব্যাবিলন দুর্বল হয়ে ডুবেছে। প্রাচীন গ্রিসেও ধার দেনা করে রাজ্য ডোবানোর গল্প পাওয়া যায়। রোম সাম্রাজ্যের পতনের শেষের দিকে রোমের রাজাদের ওপর ঋণের চাপ মারাত্মক ছিল। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যুদ্ধ ও যুদ্ধবাবদ ক্ষতিপূরণ মেটানোর জন্যে ধনকুবেরদের কাছ থেকে ধার নেওয়া হত। এর ফলে প্রজাদের ওপর আর্থিক দায়ভার বাড়ত। খরচের হার বাড়ত। এর ফলে জনরোষ বাড়ত। রাজ্য বা সাম্রাজ্যের পতন হত।
ফরাসি বিপ্লবের মূলে ছিল ঋণের বোঝা। ফরাসি রাজা ১৪তম লুই থেকে ১৬তম লুই আন্তর্জাতিক ধনকুবেরদের কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে ঋণ নিত। ফ্রান্সের রাজাদের বিলাসিতা আর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়। ধনকুবেররা ধার দিতে অস্বীকার করে। খরচের যোগান দিতে ১৭৮৯ সালে জনতার ওপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো হয়। এর প্রতিবাদে ফরাসি বিপ্লব শুরু হয়। ফরাসি সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয় ফরাসি বিপ্লব।

ধার নেওয়ার স্বভাব ভারতকেও ইতিহাসসিদ্ধ অন্তহীন খাদের দিকে চালিত করছে। ২০১৩ সালে ভারত সরকার ঋণ করেছিল ৫৩ লক্ষ কোটি টাকা। প্রতি বছর ধার নেওয়ার পরিমাণ বেড়েই চলেছে। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে ২১৪ লক্ষ কোটি টাকা ধার করার সুপারিশ এসেছে। মোটা হিসেবে মানুষের ওপর ঋণের চাপ ৮০০% বেড়েছে। উপার্জন দূর অস্ত ধার দেনা করে সরকার চালাতে হচ্ছে। দিনের পর দিন ধার বেড়েই যাচ্ছে। আমার উদাহরণের সব রাজাই ঋণ নিয়ে সাম্রাজ্য ডূবিয়েছে। অযোধ্যার নবাব, হায়দারাবাদের নিজাম সবাই ডুবেছে। রোমের রাজারা ডুবেছে। ফ্রান্সের রাজারা ডুবেছে। ধারের ফাঁদে পা ডুবিয়েছে ভারতসম্রাট নরেন্দ্র মোদিও। কোনদিন ডুবে যাবে।

Post a Comment

0 Comments