রাজাদের দৈব অধিকার তত্ত্ব


Divine Right of Kings বা রাজাদের দৈব অধিকার তত্ত্ব।

নিজের বর্চস্ব কায়েম রাখতে প্রাচীনযুগ থেকে মধ্যযুগের রাজারা নিজেদের ঈশ্বরপুত্র, ঈশ্বরের দূত, ভগবানের সেবক, দেবদূত ইত্যাদি নাম ঘোষণা করতেন। প্রজাদের ওপর রাজাদের প্রভাব ছিল গভীর। রাজার বিরুদ্ধে যাওয়া পাপ। রাজার বিরুদ্ধে কুকথা শোনা পাপ। রাজা মানে ভগবান। মানুষকে ভীতু করে দেওয়া হত। এই ধরণের তত্ত্ব দিয়ে ধর্মভীরু প্রজাদের ওপর রাজার প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্য বজায় রাখা হত। রাজতন্ত্র ও দৈবরাজতত্ত্ব দিয়ে শাসন করা হত।

প্রাকবৈদিক যুগের এক রাজা ছিলেন রাম। এক সময়ে অযোধ্যার রাজা হয়েছিলেন। বলা হয় দৈবিক শক্তি ছিল তাঁর। তবে রাম কখনো নিজেকে ভগবানের দূত বলেননি। তিনি নিজেকে মানুষ ভাবতেন। তিনি তাঁর বায়োলজিকাল বাবার ছেলে হিসেবে স্বীকৃতি পেলে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। হিন্দুমতে বিষ্ণুর সপ্তম অবতার বলা হয় দশরথপুত্র রামকে।

পারস্যের প্রথম সম্রাট সাইরাস ও তৃতীয় সম্রাট দারিয়াস নিজেদের ঈশ্বরের দূত বলতেন। মিশরের ফারাও রাজারা নিজেদের “রা”-এর বা সূর্যবংশের দেবতা বলে প্রচার করতেন। ফারাও রাজবংশের ক্ষমতার ও ধর্মের প্রতীক ছিল পিরামিড। দিগ্বিজয়ী রাজা গ্রেট আলেকজান্ডার নিজেকে দেবতা আমুনের পুত্র বলতেন। কুন্তীপুত্র কর্ণ ও  গ্রীকরাজা আলেকজান্ডারের গর্ভধারণের কাহিনীর মধ্যে হুবহু মিল পাওয়া যায়।

ইসলাম ধর্মের রাজাদের রাজতন্ত্রের মধ্যেও দৈবাধিকার তত্ত্ব (Divine Right of Kings) দেখা যায়। তবে এখানে আল্লাহ’র দূত না বলে প্রতিনিধি বা খলিফা বলা হয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাসে আছে, খ্রিস্টান ধর্মের রাজারা সরাসরি ঈশ্বর দ্বারা মনোনীত হন। ফ্রান্সের রাজা ১৪তম লুই’ নিজেকে সূর্যদেবতা বলতেন। তাঁর যাবতীয় শক্তি ঈশ্বরপ্রেরিত বলে প্রচার পেত।

আধুনিক যুগেও ভগবান প্রদত্ত অধিকার তত্ত্ব প্রয়োগ ও প্রচারের প্রমাণ পাওয়া যায়। ভারতের বর্তমান রাজা নরেন্দ্র নিজেকে ঈশ্বরের দূত হিসেবে প্রচার করেন। এমনকি তিনি নিজেকে ননবায়োলজিকাল বলার চেষ্টা করেন। আগেই বলেছি রাম নিজেকে ‘বায়োলজিকাল’ বলতেন। রাজা নরেন্দ্র রঘুবংশীয় রামের চেয়েও কুলীন বংশ হতে চেষ্টা করেন। ঠিক তেমনি, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজা ডোনাল্ড বহুবার নিজেকে ঈশ্বরের দূত বা প্রতিনিধি হিসেবে প্রচার করেছেন। ডোনাল্ড সম্প্রতি পোপের চেয়েও উচ্চ স্থানাধিকারী হিসেবে নিজেকে জাহির করেছেন।


যে কোন যুগে, যে কোন রাজার মধ্যে ঈশ্বর হওয়ার প্রবণতার জনক কিন্তু আমাদের মতো প্রজারা। ক্ষমতার প্রতি আনুগত্য দেখানোর জন্যে ঈশ্বরের ছায়া সামনে আনা হয়। বশ্যতা স্বীকার করানোর জন্যে ঈশ্বরের টোপ দেওয়া হয়। আমরা সাধারণ প্রজা। এই টোপ গিলে গলায় বঁড়শি ফাঁসিয়ে জীবনযাপন করি।

Post a Comment

0 Comments