প্যান্ডেলের বাইরে একটা মেটাল ডিটেকটারের গেট। ওখান দিয়েই ঢুকতে হয় প্যান্ডেলে। গুলি বন্দুক কাট্টা নিয়ে কেউ যেন ঢুকতে না পারে। এবছর প্যান্ডেলে ঢোকার জন্য আরেকটা গেট বেড়েছে। আমিষ আর নিরামিষ বেছে দেওয়া হচ্ছে। শালীন অশালীন বাছা হচ্ছে। প্যান্ডেলের বাইরে গেটের বাইরে নিরামিষ লোকজন পাহারা দিচ্ছে। মাংসখেকো ইজ নট এলাউড। স্বল্প বসনা নট এলাউড। প্যান্ডেলের পবিত্রতা ফিরিয়ে আনতে কমলা রঙের আকাশ। কমলা রঙের বাতাস। কমলা রঙের পাতাল। গাঁদা ফুলের গন্ধে চারদিক পবিত্র হয়ে যাচ্ছে।
মা দুর্গা ততক্ষণে গটগট করে প্যান্ডেলে উঠে গেছেন। ওঁকে সসম্মানে ড্রেসিং চেম্বারে ঢুকিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দিল ছেলেগুলো। দণ্ডবত প্রণাম ঠুকে মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে আবার গেটের বাইরে আবার পাহারায় দাঁড়াল। এমন সময়ে মায়ের বাহন সিংহ মামা হাজির। ছেলেগুলো মামাকে দাঁড় করাল। আপনি প্যান্ডেলে ঢুকতে পারবেন না। মাংসখেকো কোন জানোয়ারকে আমাদের প্যান্ডেলে ঢুকতে দেওয়া হবেনা। আপনি এখান থেকে কেটে পড়ুন তো।
এ এক নতুন দেশ। প্যান্ডেলে মায়ের ধারে কাছে আমিষভোজী কেউ যেতে পারবেনা। মায়ের বাহন প্যান্ডেলে না চড়লে পুজো হবে কি করে! মামা কিছুতেই বোঝাতে পারছেনা। একটা ছেলে মামাকে বলল, আপনি তো ফুল বেলপাতা চিবিয়ে চারদিন থাকতে পারবেন না। আপনি তো মাংসখেকো। মায়ের সুরক্ষার জন্যে আপনাকে প্যান্ডেলে ঢুকতে দেওয়া হবেনা। সিংহ মামা অবাক। আরেকটা ছেলে এগিয়ে এসে বলে গেল, মামা অবাক হওয়ার কিছু নেই। আপনি গোরুখোর। আপনি প্যান্ডেলে চড়লে আমাদের ধর্ম অশুদ্ধ হবে। বরং বেড়া টপকে বাংলাদেশের কোন প্যান্ডেলে ঢুকে পড়ুন।
অসুরের সঙ্গেও ছেলেগুলো ঝামেলা বাধিয়ে দিল। ধর্মবিরোধী অসুর প্যান্ডেলে ঢুকতে পারবেনা। অসুর বেগতিক দেখে আবার মোষের পেটে লুকিয়ে গেল। মোষটা প্যান্ডেলের গেটে এসে ছেলেগুলোকে ফুড আইডি দেখাল। নিরামিষভোজী হলে প্যান্ডেলে ঢুকতে পারে। গেটপাস পেয়ে গেল মোষ আর তার পেটের অসুরটা। তবে ছেলেগুলো মোষটাকে শাসিয়ে দিল। মায়ের ধারে কাছে যেওনা। টুক করে তোমার গলা কেটে একটা সেলফি তুলে নিলে আমার চাকরি চলে যাবে। এবার পুজো অন্যরকম। কাটাকুটি, রক্ত মাংস ওসব পবিত্র ধর্মে থাকবেনা। ফুল আর বেলপাতা ছাড়া কোন গল্প নেই। মায়ের হাতের বল্লমটা সরিয়ে ওখানে একটা ওয়াইপার গুঁজে দিয়েছি। জগতজননী পৃথিবীর কলঙ্ক মুছে দেবেন ওটা দিয়ে। পুজো তদারকি করা আমাদের কর্তব্য। মোষহত্যা নিয়ে ফালতু একটা ধার্মিক ঝামেলা হতে পারে। মা ফেঁসে যাবে। বরং, তুমি সাইডের একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ো।
লক্ষ্মী সরস্বতী ঠাকুরাইন ঢুকতে গিয়েও ফেঁসেছেন। ওরকম টাইট করে শাড়ী পরা যাবেনা। শাড়িতে তিরিশটা ভাঁজ রাখা যাবেনা। শরীরের সঙ্গে শাড়ি লেপটে থাকলে হবেনা। ঢিলেঢালা রাখতে হবে। একটু সভ্য হয়ে ঢুকুন। দেবতা ক্যাটাগরিতে আছেন। এইটুকু বোধ তো থাকা দরকার নাকি! এখন থেকে আমরা এবার এসব বেয়াদপি আর সহ্য করবনা। প্যান্ডেলে ঢোকার আগে সবাইকে চেক করে ঢোকানো হচ্ছে। উপযুক্ত ড্রেস পরিয়ে স্টেজে না পাঠালে কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে। এবারের পুজো একটু অন্যরকম হচ্ছে। ওসব শালপাতা, মিহিদানা, বিড়ি, সন্দেশ দিয়ে ড্রেস ডিজাইন করাবেন না। গাঁজা কেসে ফাঁসিয়ে দেব। আপনারা ড্রেস চেঞ্জ করে আসুন।
ছেলেগুলো গণেশের বাহন ইঁদুরটাকে প্যাণ্ডেলে ঢুকতে দেখে ঝাঁটা পিটিয়ে দিয়ে মেরে ফেলল। রাতবিরেতে প্যাঁচার ডাক অশুভ। সনাতনী সায়েন্সের ছেলেগুলো লক্ষ্মীর বাহন প্যাঁচাকে তাড়িয়ে দিল। হাঁসে ডিম দেয়। ডিম আমিষ। ঢুকতে দেওয়া হবেনা। সরস্বতীর হাঁস প্যান্ডেলের বাইরে একটা ডোবায় গিয়ে বসল। কার্তিক ভগবান ময়ুর নিয়ে আসতে পারেননি। ভেল্কি ভগবানের বাগানে সেই ময়ুরটা বন্দী আছে। স্টেজে সেই উদ্দীপনা নেই। আকর্ষণ নেই। ভাইব নেই।
প্যান্ডেলের একশো মিটারের মধ্যে কোন চাট ফুচকার দোকান বসেনি। চাউমিনের দোকান নেই। কাবাব বসেনি। এগরোল নেই। তাই প্যান্ডেলে ভোজনরসিক বাঙালির ভীড় নেই। গল্প নেই। চা নেই। বিড়ি নেই। এসব পুজোর দিনগুলোতে চলবেনা। উপোস করে বেলপাতা আর গঙ্গাজল ভরা ঘট ছাড়া পুজোর প্যান্ডেলে ঢুকতে পারবেনা। জুতো চটি পরে প্যান্ডেলে ঘোরা যাবেনা। মনে রাখতে হবে এটা কোন উৎসব নয়। এটা পুজো। এটা দুর্গোৎসব নয়। এটা শারদোৎসব নয়। বিশুদ্ধ সনাতনী মতে দুর্গাপুজো হবে এবার।


0 Comments