দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থির অবস্থায় জাপানে রাজনৈতিক দলের ওপর সামরিক প্রভাব বাড়তে থাকে। এই উত্তাল সময়ে তোজো জাপানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান। সমস্ত রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তিনি নিজেকে ঈশ্বরের সমকক্ষ ভাবতেন। তোজো চরম কমিউনিস্ট বিরোধী ছিলেন। এই সময়ে কমিউনিস্টদের ওপর চরম অত্যাচার করা শুরু হয়। তিনি চরম জাতীয়তাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ছিলেন। সেই সূত্র ধরে তোজো সম্বন্ধে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ঘৃণায় ভরা। তোজোর সাথে নেতাজির সখ্যতা কমিউনিস্ট পার্টি অবশ্যই ভাল চোখে নেয়নি।
এই সময়ে সিঙ্গাপুরে প্রায় ৮৫০০০ ব্রিটিশ সৈন্য জাপানের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্যে অধিকাংশই ছিল ব্রিটিশদের হয়ে লড়তে থাকা ভারতীয় সৈন্য। তোজোর সাহায্যে নেতাজি সেই বন্দী সেনাদের নিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করে । তোজোর সাহায্য ছাড়া আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করা যেতনা। আজাদ হিন্দ ফৌজের জনপ্রিয়তা ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নেতাজির পরিকল্পনার সফলতা দেখে কমিউনিস্টদের ভুল ভাঙে। নিজেদের ‘ঐতিহাসিক ভুল’ স্বীকার করে কমিউনিস্টরা।
বর্তমান সময়ে দেশীয় ভক্তরা চালাকি করে কমিউনিস্ট বিরোধী কথায় এই দুটো শব্দ খুব উচ্চারণ করে। -- তোজোর কুকুর। তারা কি জানে ৩৪ বছরের শাসনকালে কমিউনিস্টরা নেতাজির জন্যে কি কি করেছে! সময় থাকলে দেখে নিতে পারেন।
৩৪ বছরের শাসনকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাস্তা ঘাট, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান নেতাজির নামে নামকরণ করে উৎসর্গ করা হয়। ১৯৯৫ সালে দমদম বিমানবন্দরের নাম নেতাজির নামে করা হয়। কমিউনিস্টরাই করেছে।
১৯৯৭ সালে নেতাজির জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে তৎকালীন জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার আইন পাস করে রাজ্যের প্রথম মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করে এবং এটি নেতাজির নামে উৎসর্গ করা হয়। নামকরণ হয় নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। দক্ষিণ এশীয় ইতিহাস ও ভূরাজনীতি গবেষণার জন্য বামফ্রন্ট আমলে কলকাতায় একটি গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। নামকরণ হয় নেতাজি ইনস্টিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ।
কলকাতার রেড রোডে নেতাজির যে বিখ্যাত পূর্ণাবয়ব তেজস্বী ধাতব মূর্তিটি রয়েছে। কমিউনিস্ট আমলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর উপস্থিতিতে পূর্ণ সরকারি মর্যাদায় মূর্তিটি স্থাপন করা হয়। নেতাজির পৈতৃক বাড়ি 'নেতাজি ভবন' (এলগিন রোড)-কে জাতীয় স্মারক ও গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বামফ্রন্ট সরকার কলকাতা পৌরসংস্থা ও রাজ্য সরকারের তরফ থেকে জমি, করছাড় এবং আর্থিক অনুদান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা করেছিল।
৩৪ বছরের শাসনকালে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন ধরণের কুচকাওয়াজ ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে নেতাজির জন্মদিবস পালন করা হত। ৩৪ বছরের শাসনকালের জন্যেই আজ নেতাজিকে আমরা ভুলিনি। বামফ্রন্ট সরকারের সময় থেকেই ২৩শে জানুয়ারি দিনটিকে কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় ছুটি এবং 'দেশপ্রেম দিবস' হিসেবে ঘোষণা করার দাবিতে বাম দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংসদে ও রাজপথে দাবি জানাত। আর কোন দল এসব করেনি। বিজেপি তো করেইনি। উলটে দাম্ভিক কিছু নেতা নেতাজিকে গালমন্দ করছে। নেতাজির মূর্তি ভাঙছে। নেতাজির নামের রাস্তার নাম পাল্টে দিচ্ছে। আরএসএস-এর বিষ ঢোকাচ্ছে বাংলায়।
কাউকে এই প্রসঙ্গে কোন মন্তব্য করতে শুনবেন না। পরম ভক্তদের জন্যে সুখবর একটাই যে চুরাশি বছর আগে কমিউনিস্টরা নেতাজিকে একবার তোজোর কুকুর বলেছিল।

0 Comments